শৈশবের দিনগুলো
১৯৬২ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলার হযরতপুর ইউনিয়নের বয়াতিকান্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আমার জন্ম। শৈশবে আমি খুব ডানপিটে ছিলাম। দুরন্তপনার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি আমি। বুঝতে শিখার পর থেকেই খেলাধুলার পাশাপাশি বাবা-মায়ের হাত ধরেই চলে পড়ালেখার হাতেখড়ি। এক সময় বাবা-মা প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া প্রয়োজন অনুভব করেন তখন আমার বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন হযরতপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহতাব উদ্দিন স্যারের কাছে। বাবা আমাকে নিয়ে গিয়ে স্যারকে বললেন, আমার ছেলেকে আপনার হাতে তুলে দিলাম। এখন থেকে আমানের সকল দায়-দায়িত্ব আপনার। আপনি ওকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন।
সেদিন থেকে হযরতপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার শিক্ষাজীবন শুরু। শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতার কারণে আমি ১৯৭১ সালে হযরতপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক বৃত্তিসহ পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হই। সেই থেকে আমাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রতিটি পরীক্ষায় আমি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছি। এর মূল প্রেরণা আমার বাবা-মা। তাঁদের কড়া শাসন এবং অনুপ্রেরণায়ই আমি আজ এতদূর আসতে পেরেছি। যিনি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, তিনিও ছিলেন অনেক বেশি কঠোর। শিক্ষাজীবন শুরু থেকে একজন ভালো ছাত্র হিসেবে আমার পরিচিতি ছিল। এভাবেই আমার লেখাপড়া শুরু হয়েছিল।
আমার শ্রদ্ধেয় মাহতাব উদ্দিন স্যার, তাঁর কঠোর অনুশাসনে, ভালোবাসায়, অনুপ্রেরণায় আমার ছাত্রজীবন শুরু হয়।

১৯৭৯ সালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর আমান উল্লাহ আমান ছাত্রদলের একজন কর্মী হিসেবে যোগদান করে। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীম উদ্দীন হলে নেতৃত্বের মাধ্যমেই ছাত্রদলকে সুসংগঠিত করতে থাকে। একটি বৃহৎ কর্মীবান্ধব সংগঠন তৈরি হলো আমান উল্লাহ আমান ভাইদের নেতৃত্বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন চাঙ্গা, এই সময় ১৯৯০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো এবং আমান উল্লাহ আমান ভাইদের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। সেই নেতৃত্বই পরবর্তীতে স্বৈরাচার এরশাদ পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীন সমর্থনে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর ভোটে নিরুঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সমর্থিত আমান - খোকন - আলম পরিষদ।৬ জুনের নির্বাচনের আগে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র এবং স্বৈরাচারের দোসরদের রুখে দিতে বলেছিলেন আমান-খোকন-আলম প্যানেল যদি ১ ভোটও পায় তবুও এটা আমার প্যানেল। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অকুণ্ঠ এবং আপোষহীন নেতৃত্ব আমান-খোকন-আলম প্যানেলের বিজয়ের অন্যমত চাবিকাঠি

বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মতানৈক্য থাকলেও আমরা সবাই এই ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছি যে, স্বৈরাচার হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের পতন আন্দোলনে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবো। আপনারা জানেন এর পরপরই স্বৈরাচার আর বেশিদিন টিকতে পারেনি। ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারের দোসর অভি-নিরুর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক গোলাগুলির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। স্বৈরাচারের লেলিয়ে দেওয়া বাহিনী অত্যন্ত কাছ থেকে ডা. মিলনকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। সারা বাংলাদেশে তখন স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন আরও বেগবান হতে থাকলো।
অবশেষে '৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরাচার হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। আমরা যে ওয়াদা বা অঙ্গীকার করেছিলাম জাতির কাছে, জনগণের কাছে, ছাত্র সমাজের মাঝে, আমরা আল্লাহর রহমতে সেই দিন সেই অঙ্গীকার রক্ষা করতে পেরেছি।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমান উল্লাহ আমানের ছিল না ।
কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা ঈদগাহ ময়দানে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ তাঁর পক্ষে স্লোগান দেয়। এই জনমতের কথা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জানতে পারেন।
বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে ডেকে পাঠান এবং সরাসরি কেরানীগঞ্জ থেকে নির্বাচন করার নির্দেশ দেন। আমান উল্লাহ আমান নিজের অপ্রস্তুতির কথা জানালেও খালেদা জিয়া অনড় থাকেন এবং প্রতিপক্ষকে (যুবলীগ চেয়ারম্যান মোস্তফা মহসিন মন্টু) পরাজিত করার জন্য তাঁকে উৎসাহ দেন।

৯৬ তে হাসিনা সরকার গঠনের কিছুদিন পরেই দেশের মানুষের কাছে তার শাসনআমল হয়ে উঠে দুঃসহ। দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি, চরম দুর্নীতি, সন্ত্রাসের আধিপত্য বেড়ে মানুষ চরম অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীন আর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আমরা মানুষের অধিকারে পক্ষে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে রাজপথে নামী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যুবদল, ছাত্রদলসহ আরো সমমনা দলগুলো। পরবর্তীতে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেশের জনগণ আবারো বিএনপি তথা চারদলীয় ঐক্যজোটকে বিজয়ী করে এবং শুধু বিএনপি ১৯৩ টি সংসদীয় আসনে বিজয়ী হয়ে নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়

বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমান ঢাকা-৩ আসন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি ও জুন) এবং ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই জয়গুলোতে তিনি মোস্তফা মহসীন মন্টু, মো. শাহজাহান এবং নসরুল হামিদ বিপুর মতো প্রার্থীদের পরাজিত করেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা কেন্দ্রিক এই আসনগুলো থেকে তিনি দীর্ঘ সময় সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

২০০৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আমি গ্রেফতার হওয়ার পরে, অজানার উদ্দেশ্যে কোথাও একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বুঝতে পারলাম, এটা বিডিআর-এর হেড কোয়ার্টার। সেখানে আমাদের চোখ বেঁধে নির্যাতন করা হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি আমাদের চোখ বেঁধে গাড়িতে ওঠালো। জিজ্ঞেস করলাম কোথায় নেওয়া হচ্ছে। তারা কোনো কথাই বললো না। গাড়ি চলতে লাগলো আবারও অজানার উদ্দেশ্যে।

হাসিনা বিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে অগণিত বার অবৈধ গ্রেফতার, ৩০০ এর অধিক ভুয়া ও গায়েবী মামলার শিকার। এই দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পথচলায় আমরা হারিয়েছি হাজার হাজার কর্মী সমর্থক। ফ্যাসিস্ট হাসিনার গুমবাহিনীর হাতে গুমের শিকার হয় কয়েক হাজার নেতাকর্মী। ৬০ লক্ষ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হয় লক্ষ লক্ষ মামলা । সর্বশেষ হাসিনা পতন আন্দোলন চলাকালীন ১৬ জুলাই, ২০২৪ সালে পুনরায় গ্রেফতারের শিকার। হাসিনার এই আক্রোশ থেকে রক্ষা পায়নি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী , বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাকে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় অবৈধ কোর্ট অবৈধ সাজা দিয়ে জেলে পাঠায় । জেলে থাকা অবস্থায় তাকে স্লো পয়জনের মাধ্যমে চরম অসুস্থ্য করে ফেলা হয় তবু উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দেয়নি । যার ফলশ্রুতিতে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬ ঘটিকার সময় বাংলাদেশের এই আপোষহীন নেত্রী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উনাকে বেহেস্তের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুক। আমীন ।
যে মূল্যবোধ এবং বিশ্বাস আমাকে প্রতিদিন এগিয়ে নিয়ে যায়
প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করাই আমার প্রথম অঙ্গীকার। জনগণের কণ্ঠস্বরই সর্বোচ্চ ক্ষমতা।
দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার রক্ষা করা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই নীতিতে বিশ্বাস এবং বাস্তবায়ন।
কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত
আপনার কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ। একসাথে আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ব।